শীর্ষ সংবাদ

একান্ত সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার সুনামগঞ্জের শিমুল

unnamedআল-হেলাল::
নরওয়ের বিখ্যাত স্পোর্টস ব্রান্ড গোফিট এর আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার বাংলাদেশের এসএস হক শিমুলের ডিজাইন করা এ্যাপারেলস বর্তমানে ইউরোপের স্পোর্টস মার্কেটে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রেসলার, ফাইটার, রানার, বক্সার, ক্রসফিট ফিটনেস, ফুটবল, বাস্কেটবল, ভলিবল সহ অন্যান্য সব স্পোর্টস ব্যক্তিত্বদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। ইউরোপের বিখ্যাত স্পোর্টস ব্যক্তিত্বরা মডেলিং করছেন বর্তমান বিখ্যাত স্পোর্টস ব্রান্ড “গোফিট” এর জন্য। এসএস হক শিমুলের ক্যারিয়ারের শুরু মুম্বাই এর একটি গার্মেন্টস এক্সপোর্ট হাউজের আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে। তারপর ক্যারিয়ারে সফল হওয়ায় আরো বড় স্বপ্ন নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন আর অনুসন্ধান করতে থাকেন একটি ভালো ব্রান্ডে চাকুরীর জন্য। একসময় পেয়ে যান একটি আমেরিকান লাইফ স্টাইল ব্রান্ডের ডিজাইনারের পদ তবে সেই কোম্পানীতে বেশিদিন আর কাজ করা হয়নি। তারপর ফ্রিলেন্স ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন কিছুদিন আর খুজতে থাকেন একটি স্থায়ী চাকুরী। অবশেষে মিললো নরওয়ের বিখ্যাত স্পোর্টস ব্রান্ডের জন্য ডিজাইনের এসাইনমন্টে। ওই এসাইনমেন্টের ডিজাইনটি উক্ত ব্রান্ডের ম্যানেজিং বোর্ডের কাছে আশার চেয়ে বেশি ভাল লাগায় অফার পান স্থায়ীভাবে চাকুরী করার জন্য কিন্তু সেখানে বাঁধ সাদে দূরত্ব। ওয়ার্ক পারমিট প্রদান করতে যে সময় লাগে সেই সময় ওই কোম্পানীর হাতে ছিলনা। কিন্তু তাদের এসএস হক শিমুলকে চাই ই চাই, যদিও গোফিটের আরো অনেক ডিজাইনারই আছেন। কোম্পানী থেকে নির্দেশ দেওয়া হলো আপাতত বাংলাদেশে বসেই কাজ করতে যতদিন না তাকে নরওয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসএস হক শিমুলও এই ব্রান্ডের বেতন-ভাতাদি জেনে অনেক খুশি মনে কাজ করতে লাগলেন। এসএস হক শিমুল অসংখ্য জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক ব্রান্ডের জন্য কাজ করেছেন তবে সবচেয়ে বেশি সম্মান ও পারিশ্রমিক পেয়েছেন নরওয়ের ওই ব্রান্ড গোফিট থেকে। গোফিট এ কাজ করার আগে এসএস হক শিমুল কাজ করেন আমেরিকার লাইফ স্টাইল ব্রান্ড জাস্ট চ্যাজিং, ক্যালিফোর্নিয়ার ক্রিস্টান এ্যাপারেলস সহ অনেক বিখ্যাত কোম্পানীতে, তবে সেগুলো বেশিদিন স্থায়ী হয়নি বিভিন্ন কারণে। এই প্রতিবেদকের সাথে এসএস হক শিমুলের সাক্ষাৎকারটি নি¤েœ দেওয়া হলো-

unnamed (1)প্রতিবেদক : ফ্যাশন ডিজাইনার বলতে কি বুঝায় ? ফ্যাশন ডিজাইনের যাত্রা কবে থেকে শুরু হয়েছে কিভাবে ?
শিমুল : এখানে প্রশ্নটি দুই রকম হবে অথবা উত্তরটি দুই রকম হবে যেমন ফ্যাশন মানে কি অথবা ফ্যাশন ডিজাইন মানে কি ? ফ্যাশন মানে হলো জনপ্রিয় স্টাইল অথবা স্টাইল চর্চা বিশেষ করে ক্লথিং, ফুটওয়্যার, এক্সেসরিজ, মেকআপ, শরিরের অঙ্গভঙ্গি অথবা ফার্নিচার। আর ফ্যাশন ডিজাইন মানে হলো পোশাক আশাকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্জের আর্ট। ফ্যাশন ডিজাইন আবার দুই বিভাগে বিভক্ত একটি হলো রেডি টু ওয়্যার আরেকটি হলো কউটিউর। ফ্যাশন ডিজাইন প্রাকৃতিক ও সামাজিকতায় অনুপ্রাণিত এবং জায়গা ও পরিবেশ অনুযায়ী এটি হয়ে থাকে। পাশ্চাত্যে ফ্যাশন ডিজাইনের অফিসিয়াল ইতিহাস অনুযায়ী (যদিও ফ্যাশনের ইতিহাসের শুরু সেই আদম আ: এর শুরু থেকেই) ফ্যাশন ডিজাইন শুরু হয় উনিশ শতকে বিশ্বের প্রথক ফ্যাশন ডিজাইনার চার্লস ফ্রেদেরিক ওয়্যার্থ এর ডিজাইন তৈরী করার মাধ্যমে। তারপরে ফ্রান্সের রানী মেরি এন্টয়নিটি তার ড্রেসমেকার রোজ বার্টিনকে দিয়ে ১৭৪৭ সালে কউটিউর গাউন ডিজাইন করানোর মাধ্যমে তিনি আবিস্কার করেন আধুনিক ফ্যাশন ডিজাইন। তার সেই ফ্যাশন ডিজাইনের পর ফ্যাশন ডিজাইন ফরাসিদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরী করে এবং তাকে অনেকে তখন ব্যাঙ্গ করে বলতেন “ফ্যাশন মন্ত্রী”। এরপর তিনি তার ডিরেকশনে ডিজাইন হওয়া পোশাকের একটি শপও খুলেন পেরিসে। তবে তার সেই পোশাকগুলো ছিলো ফরাসিয়ান স্টাইলে। এরপর ফরাসি বিপ্লবের সময় তিনি পালিয়ে লন্ডনে চলে যান এবং পরবর্তীতে তার সেই ফ্যাশন ডিজাইন পায় ভিন্ন রূপ যা তার করা সেই ফরাসিয়ান স্টাইলে ছিলোনা। যাই হউক আমাদের জীবনটাই একটা ফ্যাশন। ভাটি অঞ্চলের সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের লোককবি মরহুম কামাল পাশা (বাউল কামাল উদ্দিন) তার জীবদ্ধশায় একটি আঞ্চলিক গানে এই ফ্যাশনের কথাই বলে গেছেন। গানটি হচ্ছে,
“ শুনা মাইগো মাই বিয়া করাইয়া মোরে বানাইলা জামাই
রাত পোহালে বউয়ে বলে করো গিয়া কামাই।।
মাইগো মাই, যৌবনের জ্বালা আমি সহিতে পারলামনা
বিয়ে করতে হইলাম রাজী ভবিষ্যত চাইলামনা।
সাজিয়া গুজিয়া যখন শ্বশুড় বাড়ি যাই
সুন্দর বধূ ঘরে আনলাম সুখের সীমা নাই।।
মাইগো মাই কয়দিন পরে বউয়ে বলে যাইতায়নি বাজারও
আমার লাগি একটা জিনিস আনতায় যদি পার।
ছোট বেলার অভ্যাস আমার দুই টোঠে লাগাই
লাল রঙের জিনিসটা কিন্তু নাম জানা নাই।।
মাইগো মাই আর বলেছিলো আইন্যও গোলাপী পাউটার
তিব্বত আর স্নো আইন্যও গালে লাগাইবার।
ভাল চাইয়া কাজল আইন্যও দুই চোখে লাগাই
এসব কথা শুইন্যা আমার হুশবুদ্ধি নাই।।
মাইগো মাই, বাপের কাইল্যা জমি ছিল মাত্র সাড়ে তিন কেদার
বেচিয়া জোগাইলাম বধুর স্নো আর পাউটার।
তিন বৎসর পরে দেখি জমি এক জৈষ্টিও নাই
আসমান ভাঙ্গিয়া মাথায় পড়লো কেমনে দিন কাটাই।।
মাইগো মাই বাজারে সব জিনিসের দর হইয়াছে চড়া
বউয়ের সদাই না আনিলে মুখ কইরালায় ত্যাড়া।
কোন দিকে একটি পয়সা রুজী রোজগার নাই
দারে আয়না কথা কয়না আমার ঘরের তাই।।
মাইগো মাই, সেদিন বধূরে নাইওর দিয়া গেছলাম আনবার দায়
শ্বশুড় বেটায় কয় আটক করছইন আর দিতাম নায়।
বউয়ে বলে তেল আর সাবান কিছু নাহি পাই
আমার লাগি আর আইওনা যাওগি ঠাকুর ভাই।।
মাইগো মাই, বিয়া না কইরা ছিলাম ভালা কইর‌্যা ঠেইকাছি
বিনা দুঃখে এখন কি আর ঘবরাড়ি ছেড়েছি।
এখন কাটুক বউয়ে মারুক বউয়ে তাতে দুঃখ নাই
বাউল এ কামাল কয় সব ছাড়িয়া হইলাম ঘর জামাই ”।। গানের স¤্রাট বাউল কামাল পাশার এই গানটির কথাগুলো বিশ্লেষন করলে যেকেউ তার ব্যক্তিজীবনে ফ্যাশনের গুরুত্ব অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।

unnamed (2)প্রতিবেদক : আপনার ক্যারিয়ারের শুরু ও সফলতা তো জানলাম। তবে আপনার এই ক্যারিয়ার তৈরী ও সফলতা আসলো কিভাবে বলেন।
শিমুল: আসলে আমার ফ্যাশন ডিজাইনে ক্যারিয়ার গড়া ও সফলতা কোন সহজ কাজ ছিলনা। আমি ছিলাম মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। সবাই চাইতো আমি পড়ালেখা করে একটি সরকারী চাকুরী করি। কিন্তু আমি স্বপ্ন দেখতাম অনেক বড় কিছু যা মানুষের কাছে ওইসময় বললে বা জানালে আমাকে নিয়ে সবাই হাসতো কারণ ওই সময় আমার সেই স্বপ্ন পূরণের কোন কিছুই আমাদের ছিলনা এমনকি সুনামগঞ্জের মতো একটি মফস্বল শহরে বসবাস করে বলিউডের ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন দেখা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই মনে হতনা মানুষের কাছে। কিন্তু আমার স্বপ্নতো আমারই, তাই আমি আমার স্বপ্ন দেখতাম আর সেই জন্য নিজের সব ঢেলে প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছি।

প্রতিবেদক: তাহলে আপনার স্বপ্নটা কি ছিল ?
শিমুল: আমার স্বপ্ন ছিলো আমি বলিউডে কাজ করবো। সারা দুনিয়া আমাকে চিনবে জানবে একজন আন্তর্জাতিক সেলিব্্িরটি হিসেবে। প্রথমে আমার স্বপ্ন ছিলো আমি বলিউডে স্ক্রিপ্ট রাইটার হবো সেই জন্যে আমি মুম্বাইয়ের বিখ্যাত একাডেমীতে এপ্লিকেশন করি যেখানে অক্ষয়কুমার ছিলেন ফ্যাকাল্টি।

প্রতিবেদক: বলিউডে স্ক্রিপ্ট রাইটার হতে চেয়েছিলেন তাহলে ফ্যাশন ডিজাইনার হলেন কিভাবে?
শিমুল: এটাই মজার ব্যাপার, আমি মুম্বাইয়ের একটি একাডেমীতে এ্যাপ্লিকেশন করার পর স্বাক্ষাতের তারিখ ছিল সেই তারিখের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। একদিন একটি রেস্টুরেন্টে নাস্তা করছিলাম হঠাৎ আমি দেখতে পেলাম “মুম্বাই মিরর” নামের একটি সংবাদপত্রে বিশাল বড় নিউজ আর দুইজন ফ্যাশন ডিজাইনার এর ছবি। নিউজটি পড়ে আমি ভাবলাম, আমি যদি স্ক্রিপ্ট রাইটারও হই তবুও আমাকে খুব বেশি মানুষ চিনবেনা কারণ ওটা ফিল্মের ইনার সাইডের কাজ। তবে ফ্যাশন ডিজাইনার হলে আমাকে সবাই চিনবে জানবে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ, মত পাল্টে নিলাম এবং শুরু করে দিলাম ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে পড়ালেখা। তবে আমি যে কঠোর পরিশ্রম করেছি ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার জন্য, তা সফল হতোনা যদিনা আমি মুম্বাই এর কিছু ফ্যাশন ডিজাইনারের সাপোর্ট পেতাম। বিশেষ করে আমার বন্ধু মুম্বাইয়ের ফ্যাশন ডিজাইনার জেবা খান (জিয়া খান), স্ওয়াতি আগারওয়াল, উইভাবি, মৃদুলা, সুমন বিশ্বকর্মা ও রিংকস ভার্মা আমাকে নিঃস্বার্থভাবে একজন সফল ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার জন্য টেকনিক্যাল থেকে ডিজাইনিং পর্যন্ত সাপোর্ট দিয়ে গেছে। আমি যতদিন এই পেশায় থাকবো ততদিন ওদের সেই নিঃস্বার্থ সাপোর্টের কথা মনে রাখব।

প্রতিবেদক: আচ্ছা, আপনিতো যেভাবেই হোক এখন একনজন সফল আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার হতে হলে কি কি লাগে ?
শিমুল: অনেকেই নিজেদেরকে ফ্যাশন ডিজাইনার পরিচয় দিয়ে থাকেন। তবে তিনি কোন ক্যাটাগরির ডিজাইনার সেটা তার কাজই বহন করে। ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয় তবে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়া সমুদ্র সাতড়ে পাড়ি দেওয়ার মতোই কঠিন। এখানে প্রথমেই আপনার কাজের মান হতে হবে ফেডারেল কপিরাইট এর আইনের মান অনুযায়ী। কারণ আপনি যখনি স্থানীয়ভাবে কিছু ডিজাইন করবেন সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবেনা। কিন্তু যখনই আপনি আন্তর্জাতিকভাবে কিছু ডিজাইন করবেন তখনই সেটা মান ভেরিফাই হবে ইউএস ফেডারেল কপিরাইট ব্যুরো দ্বারা। সেই মান ভেরিফাইয়ে যদি আপনার ডিজাইন পাশ না করে তাহলে আপনি উল্টো জরিমানায় পড়ে যেতে পারেন। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন আপনি ডিজাইন করলে শুধু কোম্পানী ছাড়া আর কেউ দেখবেনা বা দেখলেও জানতে পারবেনা যে আপনি অরিজিনাল ডিজাইন করেছেন নাকি অন্য কোথাও থেকে ডিজাইন কপি করেছেন! এটা ভাবলে চরম ভুল হবে, কারণ আন্তর্জাতিক ডিজাইনার হলে আপনার প্রতিটি ডিজাইনের প্রতিটি দাগে দাগে বিশ্বের বিভিন্ন সাইড থেকে ভেরিফাই হবে তারপর প্রোডাক্টটি যখন মার্কেটে আসবে তখন তো সবই অপেন হয়ে যাবে। যদি কোন প্রোডাক্টে আপনার ডিজাইন অরিজিনাল না হয়ে কপি হয়ে থাকে তাহলে কোম্পানীকে গুণতে হবে বিশাল অংকের জরিমানা। তখন কোম্পানীও আপনাকে ছাড়বেনা। কাজেই আমাকে সবসময় সেই জিনিস মাথায় রেখেই কাজ করতে হয় একজন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে। আমি প্রথমে যখন আন্তর্জাতিকভাবে কাজ শুরু করি তখন কিছু ওয়ার্নিং পেয়েছিলাম কপিরাইট ইনফ্রিগমেন্টের জন্য। তারপর কঠোর পরিশ্রমের মাধমে নিজেকে আন্তর্জাতিক ডিজাইনার তৈরী করেছি। আমরা আন্তর্জাাতিক ডিজাইন যারা করি তারা প্রতিটি দাগে দাগে ইউএস ফেডারেল কপিরাইট ব্যূরোর গাইডলাইন ফলো করে কাজ করি। আমার এই পর্যন্ত যত ডিজাইন আছে তার সবগুলোই হলো আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্রান্ডের জন্য যেকারনে আমার প্রত্যেকটি ডিজাইন ফেডারেল কপিরাইট পাশ করেই মার্কেটে গেছে।

প্রতিবেদক: আপনি যখন ফ্রিলেন্স ফ্যাশন ডিজাইনার ছিলেন তখন কি কি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন ?
শিমুল: আমি নির্দিষ্ট কোম্পানী ছাড়া ফ্রিল্যান্স ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে অসংখ্য কাজ করেছি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বিভিন্ন ইনডিভিজ্যুয়াল কোম্পানীর জন্য ইভেনিং গাউন, ওয়েডিং গাউন, ক্লাবওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার, নাইটওয়্যার, কিডসওয়্যার, ফুটওয়্যার এবং হলিউডের মোনালিসা খ্যাত নায়িকার জন্য আওটারওয়্যার , আমেরিকার ইউএস ইলেকশন ২০১২ এর ফ্যানদের জন্য পোশাক, হলিউড হান্টিং এ্যাপারেলস, আমেরিকার বিখ্যাত হান্টিং কোম্পানী ইয়াজবেক এর জন্য হান্টিং পোশাক, বিশ্বের সবচেয়ে বড় এয়ার শো এর জন্য পোশাক, বার্সেলোনা ও সানিচ ইউনাইটেড এর জন্য পোশাক ইত্যাদি।

প্রতিবেদক: আপনার ক্যারিয়ারের শুরুতো ২০০৮ থেকে, তাহলে এই পর্যন্ত কতগুলো ডিজাইন আপনি করেছেন ?
শিমুল: প্রথম প্রথম কাজ করা অবস্থায় গুণতে ও মানুষকে জানাতে খুব ভাল লাগতো পড়ে যখন আমার ডিজাইন অসংখ্য হয়ে গেলো তখন আর গুণতে অথবা কাউকে নতুন ডিজাইনের বিষয়ে কিছু বলতে আর ভাল লাগতোনা। এভাবে এখন আমি এতো কাজ করেছি যে আমি নিজেও অবাক হয়ে যাই এতো বিশাল ডিজাইনের সংখ্যা ভেবে। আমার আনুমানিক ১ থেকে ২ লাখ ডিজাইন অলরেডি আন্তর্জাতিক মার্কেটে আছে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে।

unnamed (3)প্রতিবেদক: একজন সফল ফ্যাশন ডিজাইনার হতে হলে কোন বিষয়টা নিয়ে বেশি পড়ালেখা করা লাগবে?
শিমুল: ভালো কথা জিজ্ঞেস করেছেন, আামাদের বাংলাদেশে আমি মাঝে মাঝে দেখতে পাই অনেক আর্টিস্ট যারা নিজেদেরকে ফ্যাশন ডিজাইনার বলে পরিচয় দেন। আসলে এরকম আর্টিস্ট যারা তারা মুলত ফ্যাশন ডিজাইন কি সেটাই জানেন না। তারা হয়তো মার্কেট থেকে টি-শার্ট কিনে এনে ওগুলোর উপর কিছু একটা এঁকেছেন আর তাতেই নিজেদেরকে ফ্যাশন ডিজাইনার বলে পরিচয় দেওয়া শুরু করে দিয়েছেন। বাজার থেকে রেডিমেড টি-শার্ট কিনে ওটার উপর কিছু আকলেই ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়া যায়না। ফ্যাশন ডিজাইনার হতে হলে এই বিষয়ে অনেক স্টাডি করতে হয়। থাকতে হয় তুলা থেকে শুরু করে সুঁতা তৈরীর সঠিক জ্ঞান, সূঁতা থেকে ফেব্রিক্স হওয়া আবার ফেব্রিক্স এ কতটুকু কি লাগবে সেই বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। গার্মেন্টস কম্পøায়েন্স, ডাইং, কোয়ালিটি, মেনুফ্যাকচারিং সহ অসংখ্য বিষয়ে ভাল জ্ঞান থাকতে হয়, আর তার জন্য ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে অনেক স্টাডি করতে হয়। যেমন ধরেন, আমি যখন গোফিট এর জন্য কম্প্রেশনওয়্যার ডিজাইন করি ওটা দেখলে যারা টি-শার্ট এ আঁকেন তারা হয়তো ভাবতে পারেন এটা শুধু কাপড়ের উপর দেওয়ার জন্য কিছু আঁকা হয়েছে তারপর প্রিন্ট করা হয়েছে। কিন্তু না! আমার ডিজাইন করা এই কম্প্রেশনওয়্যারগুলো যখন আমি ডিজাইন করি তখন আমাকে গার্মেন্ট এর সব ডিটেইলস ডিজাইন করতে হয়েছে এমনকি টেকনিক্যাল ড্রয়িংও। আমাকে ডিজাইন করে ডিটেইলস জানাতে হয়েছে যে মেনুফ্যাকচারিং এ কটন কত পার্সেন্ট হবে, স্পানডেক্স কত পার্সেন্ট হবে ইত্যাদি এবং এই পার্সেন্টেজ এর পর গার্মেন্টটি দেখতে কেমন হবে, পোশাকটি কে পরবে, যখন পোশাকটি একটি ক্রসফিট ব্যক্তি পরে এক্টিভিটিজ এ থাকবে তখন আমার ডিজাইন করা পোশাকটি কেমন দেখাবে এবং পোশাকটি পরা ব্যক্তিটি কেমন অনুভব করবে এই সবই আমাকে ডিজাইন করার সময় মেইনটেইন করতে হয়। আমার যদি এতো ডিটেইলস সম্পর্কে জ্ঞান না থাকে তাহলে আমার পক্ষে ওরকম আন্তর্জাতিক ব্রান্ডের ডিজাইন করা সম্ভব না। বাংলাদেশে যারা বায়িং হাউজ পরিচালনা করেন তারা এই বিষয়টা জানেন কারণ তারা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য গার্মেন্টস মেনুফ্যারচারিং করে থাকেন। অনেকে হয়তো এটাও ভাবেন যে কাগজে একটা পোশাক আঁকলেই মনে হয় ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়া যায়! সেটাও ঠিক নয়, মোকআপ ড্রয়িং করাটা হচ্ছে জাস্ট একটা গামেন্ট টা দেখতে কেমন হবে তার একটা সেম্পল এর আগে প্রি-সেম্পল মোকআপ। ডিজাইনারের আসল কাজ হলো গার্মেন্টটির সবকিছু করা যা আমি উপরে উল্লেখ করেছি। মোকআপ ড্রয়িং করে ফেললাম কিন্তু পোশাকটি আদৌ এরকম তৈরী করা সম্ভব কিনা আর সম্ভব হলে তা কি দিয়ে কিভাবে করতে হবে জানলাম না তাহলে হবেনা। এই জন্যেই ফ্যাশন ডিজাইনে অনেক স্টাডি করতে হবে যদি কেউ সত্যিকারের ফ্যাশন ডিজাইনার হতে চান। বাংলাদেশে দেখা যায় অনেক ছেলে মেয়ে ফ্যাশন ডিজাইনে পড়ালেখা শেষে বায়িং হাউজে মার্চেন্ডাইজার হিসেবে যোগদান করে অথবা কেউ কেউ বুটিকস খুলে সেখানে বিভিন্ন টিভি ও সিনেমার পোশাক এর সেম্পল ডেভেলপ করে। এটা হয় কারণ ওরা সত্যিকারের বাস্তবিক ফ্যাশন ডিজাইনের শিক্ষা পায়না।

প্রতিবেদক: আপনি এতো ডিজাইন করেছেন বিশ্বের বিখ্যাত কোম্পানী ও ব্যক্তিদের জন্য অথচ আপনি এখনো কোন ফ্যাশন শো করেননি, কারণ কি ?
শিমুল: ভালো প্রশ্ন, সত্যি কথা বলতে কি, আমি ক্যারিয়ারের শুরুতেই আল্লাহর রহমতে এতো বড় বড় সেলিব্রেটি ও কোম্পানীর কাজ করেছি যে আমার নিজের আউটফিটস নিয়ে ফ্যাশন শো করার সময় ও সুযোগ কোনটিই মিলেনি। প্রথমতঃ আমি যাদের জন্য ডিজাইন করেছি তারা প্রায় সবাই ওয়েস্টার্ন সেলিব্রেটি। তারা নিজেরাই নিজেদের কোম্পানীর বিশাল ফ্যাশন উইক করে থাকেন। অনেক সময় অনেক কোম্পানীই তাদের প্রেস রিলিজে আমার নাম ডিজাইনার হিসেবে দিয়েছেন এবং আমাকে ফ্যাশন উইকে অংশগ্রহন করার জন্য আমন্ত্রণও জানিয়েছেন। বিশেষ করে আমেরিকায় বিশ্বের সব বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনারদের নিয়ে একটি ফ্যাশন উইক হয় ফ্লরিডাতে, সেখানে আমাকে ৪-৫ বার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ভিসা সাপোর্টসহ। কিন্তু আমি নিজে ইচ্ছে করেই যাইনি যখন হিসেব করে দেখলাম যে ওখানে গিয়ে আমি নিজেকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারবো এছাড়া আর কিছুনা। আর সেইজন্যে আমার নিজের পকেট থেকে খরচ করে আসতে হবে। এটা ভেবেই আর যাইনি, কারণ আমি যখন প্রথম প্রথম ডিজাইন করতাম বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তি ও কোম্পানীর জন্য তখন ইচ্ছে হতো আমি কাউকে এসব দেখাই, জানাই কিন্তু যখন খুব বেশী ব্যস্ত হয়ে গেলাম আর সংখ্যাহীন কাজ করলাম বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত কোম্পানী ও ব্যক্তিদের জন্য তখন আর নিজেকে প্রকাশ করার ইচ্ছে মনের মধ্যে থাকলোনা। ভাবলাম নিজে পয়সা খরচ করে নিজেকে প্রকাশ করার দরকার কি, কোম্পানীগুলোই তো আমাকে অফিসিয়ালি প্রকাশ করাবে যখন আমি হেড অফিসে যোগদান করব। ইন্ডিয়া থেকেও আমার জন্য প্রত্যেক বছরই ফ্যাশন উইকে যাওয়ার আমন্ত্রণ আসে। আমি যেসব ব্যক্তি ও কোম্পানীর জন্য ডিজাইন করি তারা নিজেরাই ফ্যাশন উইক করে, কাজেই আমাকে তারা প্রকাশ করবেই সময় হলে।

প্রতিবেদক: নরওয়ের স্পোর্টস ব্রান্ড গোফিট এর জন্য কি কি ডিজাইন করেন ?
শিমুল: গোফিট এর আরো অনেক ডিজাইনার আছেন তবে বর্তমানে ৭৫% ডিজাইনই আমার করা, যদিও আমি শুরুতে ভাবতেও পারিনি যে এতো বড় একটি ব্রান্ডের ৭৫% ডিজাইনই আমার হাত দিয়ে হবে। এখন চিফ ডিজাইনার পদের জন্য আমি সবচেয়ে এগিয়ে আছি তাদের বিবেচনার জন্য। যেহেতু চিফ ডিজাইনার পদে নিয়োগ পেলে আমাকে তাদের অনেক বড় অংকের বেতন-ভাতাদি দিতে হবে তাই তারা এই মুহুর্তে আমার সাথে চুক্তি সম্পাদন করছেনা। তারা চাচ্ছে আমি মাঝে মধ্যে নরওয়ের অসলোতে অবস্থিত তাদের হেড অফিসে গিয়ে তাদের সঙ্গে মিটিং, রিসার্চ, প্রোডাক্ট ডেভেলমেন্ট ইত্যাদি করে আসবো। তারপর তারা সময় হলেই আমাকে ওই পদে নিয়োগ দেবে।
বর্তমানে আমি গোফিট এর জন্য ডিজাইন করছি গোফিট স্পোর্টস স্যুজ, কোম্প্রেশনওয়্যার টাইটস (এডভান্সড ও বেসিক), কেম্প্রেশন টপস, সকস, সুয়েটার, জ্যাকেটস, টি-শার্টস, হুডি, ভেস্ট সহ অন্যান্য স্পোর্টস আইটেমস।

প্রতিবেদক: আপনার অর্জনতো বিশাল অথচ আপনার সেইভাবে প্রচার নাই বাংলাদেশে, তার মানে কি আপনি প্রচারবিমুখ ?
শিমুল: প্রচারবিমুখ কোন মানুষ নাই, এটা ভুল শব্দ। প্রত্যেকটি মানুষই চায় তার ভাল কাজের কথা মানুষ জানুক তবে সেক্ষেত্রে অনেকের সফলতা আজীবন আড়ালে থেকে যায় যাদের সেগুলো প্রকাশ্যে নিয়ে আসার কথা তাদের কোন চেষ্টা না থাকার কারণে। আমার ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। আমি অর্জন করতে পেরেছি অনেক কিছু তাই বলেতো আর আমি নিজের গান নিজে গাইতে পারিনা। এটা যাদের কাজ তাদের উচিত আমাকে খুজে বের করা। প্রায় সময়ই আমি দেখি ঢাকায় বসবাস করার সুবাদে একজন মার্চেন্ডাইজারও বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে বাংলাদেশী টিভি ও পত্রপত্রিকায় আসছেন তেমন কিছু অর্জন না থাকার পরও অথচ আমি আমার জায়গাতেই আছি। যদিও প্রথম প্রথম আমার ইচ্ছে হতো মানুষ আমার অর্জনের বিষয়ে জানুক কিন্তু কেউ সেই দায়িত্ব পালন না করায় আমি হতাশ হয়ে এখন অনাগ্রহীই হয়ে গেছি। জানি আমি আজ হোক বা কাল আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে প্রকাশ পাবোই। তাই আর আগ্রহ নাই নিজের দেশের কারো কাছে নিজের অর্জন নিয়ে কিছু বলতে।

প্রতিবেদক: মানবজীবনে ফ্যাশনের গুরুত্ব কতটুকু ?
শিমুল: হাদিছে একটি কথা আছে বিশেষ করে নবীজী বলে গিয়েছেন “পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ইমানের অর্ধেক। এই পরিচ্ছন্নতার নামই ফ্যাশন বা রুচিশীলতা। ফ্যাশন মানেই যে পাশ্চাত্যের ঢংঙে পোশাক পরিচ্ছদ করা তা কিন্তু নয়। আমি আগেই উল্লেখ করেছি ফ্যাশন ডিজাইন জায়গা ও পরিবেশন বিশেষ হয়ে থাকে। ফ্যাশন মানে মূলত এটাই বোঝানো হয়েছে যে একজন মানুষ নিজেকে সুন্দর করে প্রকৃতির সাথে মানিয়ে চললে অথবা সেটা আপনি পোশাক না পরে সুন্দর ফার্নিচার দিয়ে ঘর সাজালেও ফ্যাশন হয়ে যায়। কাজেই ফ্যাশন মানেই আপনাকে মনে রাখতে হবে নিজেকে সুন্দর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।
সুন্দর পোষাক পরিচ্ছদ শুধু মানুষকেই সুন্দর করেনা। মানব মনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রসারিত করে। দুনিয়াতে যেমন সুন্দর জীবনের জন্য ফ্যাশনের প্রয়োজন আছে তেমনি মৃত্যুতেও ফ্যাশন আমাদের সঙ্গে থাকে। বিশেষ করে আমরা মরনের পর মুদ্রাকে গোছল করিয়ে সাদা পরিস্কার কাপড় পড়িয়ে কবরে সমাহিত করি। বাউল কামাল পাশা (জন্ম ১৯০১ মৃত্যু ১৯৮৫) এরকম আরেকটি মরমী গানে ফ্যাশনের কথা তুলে ধরেছেন। গেয়েছেন,
“ সাজিয়ে গুজিয়ে তোরা দে সজনীগো,সাজিয়া গুজিয়া তোরা দে।।
বড়ইপাতা গরম জ্বলে শুয়াইয়া মশারীর তলে
আতর গোলাপ চন্দন মেখে দে।।
সাদা কাপড় পড়াইয়া বাশের পাল্কি দে তুলিয়া
চির বিদায় তোমরা আমায় দে।।
শুয়াইয়া কবরে আমায় দোয়া করবে তোমরা সভায়
(আমারে) জনমের তালা লাগাইয়া দে।।
নিব আমি চির বিদায়,আর না আসিবো ধরায়
যাবো চলে কামাল পাশায় জনমের তরে”।
অনেকটা আত্মঅভিমান নিয়েই এসএস হক শিমুল কথা বলেন এই প্রতিবেদকের সাথে। জানালেন তার আরো অনেক কিছুই যা এই স্বল্প পরিসরে লেখা সম্ভব না। তার বর্তমান অবস্থানের তুলনায় তার অর্জন এতো বিশাল যে ২-৪ টা প্রতিবেদন লিখে শেষ করা যাবেনা। আশা রাখি হয়তো আবারও সুযোগ পেলে জানবো আমরা আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার এসএস হক শিমুলের আরো অর্জনের কথা। শিমুল সুনামগঞ্জের উত্তর আরপিননগর আবাসিক এলাকার বাসিন্দা।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Daily Manchitro Designed by dailysylhet.blogspot.com Copyright © 2014

Blogger দ্বারা পরিচালিত.